মাধ্যমিক ২০২০ এর প্রশ্নপত্র
১৭. আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার উপাদান রূপে 'সরকারি নথিপত্রে' র সীমাবদ্ধতা কী উত্তরঃ আধুনিক ইতিহাস চর্চার উপাদান রূপে সরকারি নথিপত্রের সীমাবদ্ধতাগুলি হল- (ক) সরকারি নথিপত্রগুলি সরকারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লেখা হয়, জনগণের দৃষ্টিভঙ্গী উপেক্ষিত থাকে। (খ) সরকারি নথিপত্রগুলিতে অনেক ক্ষেত্রে ভুল ও বিকৃত তথ্য থাকে। তাই এগুলি সমকালীন ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (গ) সরকারি নথিপত্রগুলি ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে রচিত হয় না। তাই ঐতিহাসিকদের তথ্য সংগ্রহের সময় সতর্ক থাকতে হয়। ১৮. আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথা বলতে কী বোঝায়? উত্তরঃ আত্মজীবনীঃ যে রচনায় লেখক তাঁর নিজের জীবনের ও সময়ের বিভিন্ন ঘটনাবলীর বিবরণ লিপিবদ্ধ করে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন তাকে আত্মজীবনী বলে। যেমন সরলাদেবী চৌধুরানীর 'জীবনের ঝরাপাতা'। স্মৃতিকথাঃ অতীতের কোনো বিশেষ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোনো ব্যক্তি যদি পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতি থেকে প্রাপ্ত সেই ঘটনার অকপট বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন অথবা মৌখিকভাবে প্রকাশ করেন তাহলে তাকে স্মৃতিকথা বলে। যেমন- দক্ষিণারঞ্জন বসুর 'ছেড়ে আসা গ্রাম'। ১৯. এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল? উত্তরঃ এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল- (ক) খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। (খ) পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ও নারীশিক্ষার প্রসার ঘটানো। (গ) বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও কু-সংস্কার ও গোঁড়ামি দূর করা।
২0.'নববিধান'কী? উত্তরঃ কেশবচন্দ্র সেন-এর হিন্দুমতে নিজকন্যার বিবাহ, রামকৃষ্ণ প্রীতি, খ্রিস্ট প্রীতি, চৈতন্য প্রীতি ইত্যাদি বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ তরুণ ব্রাহ্মরা ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করলে কেশবচন্দ্র সেন তাঁর উদারপন্থী অনুগামীদের নিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শে নববিধান ঘোষণা করেন এবং নববিধান ব্রাহ্মসমাজ গঠন করেন। ২১. চুয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-৯৯) গুরুত্ব কী ছিল? উত্তরঃ ১৭৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত চুঁয়াড় বিদ্রোহের গুরুত্ব হল -(ক) চুয়াড় বিদ্রোহে জমিদার ও নিরক্ষর চুঁয়াড় কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়। (খ) এই বিদ্রোহের পর সরকার বিষ্ণুপুর শহরকে কেন্দ্র করে জঙ্গলমহল জেলা গঠন করে।য়(গ) এই বিদ্রোহের পর সর। কার এই অঞ্চলে নিলামের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার নীতি ত্যাগ করে। ২২. ফরাজি আন্দোলন কি নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল? উত্তরঃ হাজী শরিয়ৎ উল্লাহ ইসলাম ধর্মের সংস্কার ও শুদ্ধিকরণের জন্য ফরাজী আন্দোলনের সূচনা করলেও পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র দুদুমিঞা এই আন্দোলনকে ধর্মীয় মোড়ক থেকে বের করে এনে একে সার্থক কৃষক আন্দোলনে উন্নীত করেছিলেন। 'জমি আল্লাহর দান, সেখানে কর ধার্য করার অধিকার জমিদারের নেই'- দুদুমিঞার এই বক্তব্যে হিন্দু-মুসলমান কৃষক আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ জমিদার বিরোধী তথা সরকার বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাই এই আন্দোলনকে নিছক ধর্মীয় আন্দোলন না বলে একে জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বলাই শ্রেয়। ২৩. 'ল্যান্ড হোল্ডার্স সোসাইটি' কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়? উত্তরঃ জমিদার রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে 'ল্যান্ড হোল্ডার্স সোসাইটি' প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্যগুলি হল- (ক) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার জমিদারদের স্বার্থরক্ষা করা এবং জমিদারদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। (খ) সরকার কর্তৃক নিষ্কর জমির বাজেয়াপ্তকরণ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা। (গ) ভারতের সর্বত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রসার ঘটানোর দাবী জানানো। ২৪. উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে 'আনন্দ মঠ' উপন্যাসটির কীরূপ অবদান ছিল? উত্তরঃ 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন। উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদের উত্থানে এই গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। যেমন- (ক) এই গ্রন্থটি স্বদেশ প্রেমের উত্থান ঘটায় কারণ গ্রন্থটিতে বলা হয়েছিল যে দেশপ্রেম হল ধর্ম এবং দেশসেবা হল পূজা। (খ) এই উপন্যাসে জন্মভূমিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে রচিত 'বন্দেমাতরম্' সঙ্গীতটি পরাধীন ভারতের বিপ্লবী মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। (গ) এই গ্রন্থটি দেশের যুবসমাজকে স্বদেশ ভক্তি, ত্যাগ ও সেবাধর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে 'স্বদেশ প্রেমের গীতা' রূপে চিহ্নিত হয়। ২৫. বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা? উত্তরঃ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন- (ক) ছাপাখানার বিকাশের ফলে বাংলা ভাষার প্রচুর বই ছাপা হতে থাকে এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশের পথ ত্বরান্বিত হয়। (খ) ছাপাখানার বিকাশের ফলে সংবাদপত্র ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার দ্বারা জনগণ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদের সাথে পরিচিতি লাভ করে। ফলে তাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২৬. ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ ছিল কেন? উত্তরঃ ভারতে ইংরেজদের প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। কারণ – (ক) এই শিক্ষাব্যবস্থা ছিল পুঁথিগত। বাস্তবমুখী প্রযুক্তিবিদ্যার অভাব ছিল। (খ) আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাদানের মাধ্যম ছিল ইংরেজি ভাষা। ফলে উচ্চবর্গের শহুরে শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষালাভের সুযোগ পেলেও ইংরেজি ভাষায় অজ্ঞ বাংলার বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষ এই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়নি। (গ) কলেজ ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। (ঘ) এই শিক্ষাব্যবস্থায় নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২৭. মোপলা বিদ্রোহের (১৯২১) কারণ কী উত্তরঃ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মালাবার উপকূলের মোপলারা জমিদার শ্রেণির সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহ মোপলা বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের কারণগুলি হল (ক) কেরালার মালাবার অঞ্চলে রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। অত্যাধিক হারে রাজস্ব দিতে গিয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে যেত। (খ) এই অঞ্চলের অস্পষ্ট প্রজাসত্ব আইনের সুযোগ নিয়ে সরকার ও জমিদাররা কৃষকদের উপর তীব্র শোষণ চালাত। ২৮. কী উদ্দেশ্যে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয়? উত্তরঃ জয়প্রকাশ নারায়ণ, ড. রামমনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পট্টবর্ধন প্রমুখের উদ্যোগে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলের উদ্দেশ্য ছিল- (ক) জাতীয় কংগ্রেসের সহায়তায় দেশে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রূপায়ণ ঘটানো। (খ) কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণিকে একজোট করে তাদের দাবীগুলি পুরণের চেষ্টা করা। (গ) কংগ্রেসের মধ্যেকার বামপন্থী নেতাদের একজোট করা।(ঘ) কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে সামিল করা। ২৯. ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বাংলার নারী সমাজ কেন অরন্ধন পালন করে? উত্তরঃ ব্রিটিশ সরকার তাদে নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার নারী সমাজ ঐদিন অরন্ধন পালন করেন। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের বিষয়টিকে তাঁরা জাতীয় শোকে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ৩০. ননীবালা দেবী স্মরণীয় কেন? উত্তরঃ ননীবালা দেবী স্মরণীয় কারণ (ক) বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকালে তিনি বিপ্লবীদের আশ্রয় দান ও গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করতেন। এজন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। (খ) জেলে থাকাকালীন অকথ্য অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি বিপ্লবীদের কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি। তাঁর দেশভক্তির আদর্শ বিপ্লবীদের মনে উৎসাহের সঞ্চার করেছিল।
৩১. সর্দার প্যাটেলকে 'ভারতের লৌহমানব' বলা হয় কেন? উত্তরঃ স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে 'লৌহমানব' বলা হয়। কারণ -য়(ক) তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব ভি.পি. মেনন ও বড়লাট মাউন্টব্যাটেন-এর সহযোগিতায় কুটনীতি ও যুদ্ধনীতির মাধ্যমে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করে দেশকে রাজনৈতিক সংকট মুক্ত করেন। (খ) তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বা পাকিস্তানের পক্ষে যোগদানে ইচ্ছুক দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতভুক্ত হলে ভারতবর্ষের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয়করণ করা এবং দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই লৌহকঠিন দৃঢ় মানসিকতার কারণে তাঁকে ভারতের লৌহমানকরেনলা হয়। ।
32. কী পরিস্থিতিতে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩)দিয়েছেন। উত্তরঃ স্বাধীন ভারত সরকার তেলেগু ভাষাভাষীদের দাবির ভিত্তিতে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে স্বতন্ত্র ভাষাভিত্তিক রাজ্য-অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন করলে, এই সাফল্যউত্তরঃহিত হয়ে ভারতের অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষরাও আন্দোলনে নামেন। কমিশন গঠনঃ ভাষাভিত্তিক রাজ্যগঠনের দাবিতে গঠিত আন্দোলনের হিংসাত্মক প্রভাব কমাতে এবং অঙ্গরাজ্যগুলির সীমানা নির্ধারণের নীতি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করেন। কমিশনের মোট সদস্য ছিলেন তিনজন, এঁরা হলেন বিচারপতি ফজল আলি, কে.এম. পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জুর।
0 মন্তব্যসমূহ